ভুটান ভ্রমণ || Part 3 (পুনাখা)

 

ভুটান ভ্রমণ Part 1 এ আমরা আপনাদের সাথে শেয়ার করেছি ভুটানের থিম্পু ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এবং ভুটান ভ্রমণ Part 2 তে শেয়ার করেছি ভুটানের পারো ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। এবার ভুটান ভ্রমণের শেষ পর্ব Part 3 তে আপনাদের সাথে শেয়ার করবো ভুটানের পুনাখা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা।

আমরা থিম্পু ও পারো ঘুরে দেখে চলে যাই থিম্পু শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে Dochula Pass এ। অন্ধকার ইতিহাসের সাক্ষ্যদানকারী স্থানকে যে অনুপ্রেরণার ও সুন্দর দর্শনীয় স্থানে রূপান্তর করা যায় সেটাই করে দেখিয়েছে ভুটান। Dochula Pass টি তৈরি করা হয় ১০৮ ভুটানি সৈনিকদের স্মরণের যারা ২০০৩ সালে মিলিটারি অপারেশনে মারা যান। এই স্থানটি শুধুমাত্র ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় দিক থেকে গুরুত্ব পায় না বরং ভ্রমণ প্রেমীদের সৌন্দর্য অনুধাবন করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। Dochula Pass এর উচ্চতা প্রায় ১০ হাজার ফুট যেখান থেকে পাবেন 360° view ।

যদি আপনার ভাগ্য ভালো থাকে তাহলে আকাশ পরিষ্কার থাকলে দেখার সুযোগ পাবেন তুষার বোঝাই হিমালয় এর চুড়া।

আর Dochula Pass এ আপনার ভ্রমন যদি ১৩ ডিসেম্বর করে থাকেন তাহলে সাক্ষী হয়ে যেতে পারেন ভুটানিদের সুন্দর এবং জাঁকজমকপূর্ণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। কারণ ১৩ ডিসেম্বর এখানে অনুষ্ঠিত হয় Druk Wangyal Lhakhang নামে বাৎসরিক অনুষ্ঠান। যদিও আমরা এ অনুষ্ঠান এর সাক্ষী হতে পারিনি কিন্তু আপনাদের যাতে মিস না হয় সে জন্য আপনাদেরকে জানিয়ে রাখা হল।

Dochula Pass ঘুরে আমরা চলে আসি পুনাখার মূল শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে পুনাখা Dzong এ। Dzong টি po-chu(পো-চু) নদীর পাশেই তৈরি হয়েছে। পুনাখা Dzong এ আসলে প্রকৃতির স্বরূপ এর মাঝে মানুষের তৈরি সৌন্দর্য বর্ধক স্থাপনার অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারবেন না। নীল আকাশের নিচে সবুজ পাহাড়ের মাঝে, নিবিড় ভাবে বয়ে চলা নদীর পাশে মানুষের তৈরী দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার মাঝে ক্ষণিকের জন্য হলেও আপনি সময় জ্ঞান থেকে হারিয়ে যাবেন। সময় থমকে যাবে আপনার কাছে।

পুনাখা Dzong ঘুরে চলে যাই পৃথিবীর দ্বিতীয় দীর্ঘ সাসপেনশন ব্রিজ এ। এই সাসপেনশন ব্রিজ এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৭০০ মিটার এই ব্রিজটি পুনাখা Dzong এর খুব কাছেই অবস্থিত।

পুনাখা Dzong ঘুরার পরে suspension bridge টি অবশ্যই ঘুরে যাবেন, কারণ এ ব্রিজের উপর দিয়ে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত যাওয়ার ১০ মিনিটের হাঁটা হাঁটি খুবই মজার এবং আনন্দদায়ক

ভুটান ভ্রমণ Part 1

ভুটান ভ্রমণ Part 2

ভুটান ভ্রমণ || Part 2 (পারো)

ভুটান ভ্রমণ Part 1 এ আমরা আপনাদের সাথে শেয়ার করেছি ভুটানের থিম্পু ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। এবার ভুটান ভ্রমণ Part 2 তে আপনাদের সাথে শেয়ার করবো ভুটানের পারো ভ্রমণের অভিজ্ঞতা।

থিম্পু ঘুরে আমরা চলে আসি পারোতে। পারো তে এসে পারো থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার উত্তরে চলে যাই টাইগার্স নেস্ট মনাস্ট্রি তে। টাইগার্স নেস্ট মনাস্ট্রির উচ্চতা প্রায় ৩ হাজার ফুট। এখানে আসতে হলে আপনাদেরকে প্রায় ৭ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পায়ে হেঁটে পেরিয়ে আসতে হবে। পরিশ্রমের ভয়ে পিছিয়ে গেলে আপনাকে হারাতে হবে টাইগার্স নেস্ট মনাস্ট্রির সৌন্দর্য।টাইগার্স নেস্ট মনাস্ট্রি শুধু তার সৌন্দর্যই দিয়েই মুগ্ধ করবে না আপনাকে, অবাক করবে তার ইতিহাস দিয়েও।

টাইগারস নেস্ট মনাস্ট্রি তে পাহাড় ঘেঁষে রয়েছে অল্প সংখ্যক বিল্ডিং। টাইগার্স নেস্ট মনাস্ট্রি হচ্ছে বৌদ্ধদের পবিত্র জায়গা যেটি ১৬৯২ সালে নির্মিত হয়েছিল গুরু Rinpoche(রিনপোচে)  এর গুহাকে ঘিরে, যেখানে গুরু Rinpoche প্রথম ধ্যান করেছিলেন। এখানেই গুরু Rinpoche কে তিব্বত থেকে পিঠে বহন করে এনেছিলো এক বাঘিনী আর সেই কারণেই এই জায়গার নাম হয় টাইগার্স নেস্ট।

এই ইতিহাস শুনে আর টাইগার্স নেস্ট এর পাহাড়ের গায়ে গড়ে ওঠা আশ্রমের সৌন্দর্য দেখার জন্য নিশ্চয়ই পরিশ্রমের জন্য পিছিয়ে যাবেন না। 

টাইগার্স নেস্ট মনাস্ট্রি ঘুরে আমরা চলে আসি পারো এয়ারপোর্ট বার্ডস আই ভিউ পয়েন্টে। আপনার চেষ্টা করবেন ১০ টা থেকে ১১টার মধ্যে এখানে আসার জন্য কারন, এই সময়ে আসলে আপনি বিমান অবতরণ দেখতে পারবেন। আপনি এখন ভাবতে পারেন বিমান অবতরন দেখার মধ্যে কি আছে? পারো এয়ারপোর্টে বিমান অবতরন দেখার কারন হচ্ছে, এই এয়ারপোর্টটি বিশ্বের ১০টি ঝুকিপূর্ণ বা কঠিন বিমান অবতরণ এয়ারপোর্টগুলোর মধ্যে একটি। সারা বিশ্বের মধ্যে মাত্র ৮ জন পাইলটকে এই এয়ারপোর্টে বিমান অবতরণ করার জন্য বিশেষ ভাবে প্রশিক্ষিত করা হয়েছে।

ভুটান ভ্রমণ Part 1

ভুটান ভ্রমণ Part 3

 

ভুটান ভ্রমণ || Part 1 (থিম্পু)

ভ্রমণের পাগলামির মাত্রা বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে আমরা গিয়েছিলাম ভুটানে। রীতিমত ভ্রমণের যাবতীয় ঝামেলা এড়ানোর জন্য আমরা যুক্ত হয়েছিলাম বাংলাদেশের একটি ভ্রমণ Group এর সাথে।

ভুটান ভ্রমণ Part 1 এ আপনাদের সাথে শেয়ার করব বাংলাদেশ থেকে ভুটান যাওয়া এবং ভুটানের থিম্পু ভ্রমণের অভিজ্ঞতা।

ভুটান এ যাওয়ার জন্য আমরা প্রথমে চলে আসি বাংলাদেশের বুড়িমারী বর্ডার আর ভারতের চেংরাবান্ধা বর্ডার হয়ে ভারতে।

ভারতের চেংরাবান্ধা বর্ডার পার হয়ে সেখান থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরত্বে আমরা চলে যাই ভারতের জয়গা বর্ডার। জয়গা বর্ডার পার হয়ে চলে যাই ভুটানের Fushimi(ফুশিমি) বর্ডারে।

বাংলাদেশ থেকে মোট চারটি বর্ডার পার হয়ে আমরা পা রেখেছিলাম ভুটানে। অনেকটা পথ জার্নি করে আসলেও ভুটানের বর্ডার এ আসা মাত্রই ভ্রমণের উত্তেজনা উজ্জীবিত হতে শুরু করে।

কারণ ভুটানের বর্ডার এর গেট বা ভুটানের যে প্রবেশদ্বারটি রয়েছে তার কারুকাজ দিয়েই ভুটান আপনাকে মুগ্ধ করতে শুরু করবে।

ভুটানে এসে আমরা যাত্রা শুরু করছিলাম থিম্পু থেকে।

ভুটানে এসে প্রথমে আমরা যাই Khamsum Yulley Namgyal Chorten(খামসুম ইউল্লি নামগাল চর্টেন) এ। Chorten মানে হচ্ছে বুদ্ধদের মন্দির। Khamsum Yulley Namgyal Chorten(খামসুম ইউল্লি নামগাল চর্টেন) টি এশিয়ার আশ্চর্য জনক ঐতিহ্য ও স্থাপনা নিদর্শন এর একটি। এই Chorten টি পূজা অর্চনা বা পড়ালেখা করার জন্য তৈরি করা হয়নি। এটি মূলত রানী মা তৈরি করেছিলেন মানবজাতির নেগেটিভ ফোর্স দূর করে জীবনের প্রশান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য।

পাহাড়ের উপর এই Chorten টি তে ঘুরতে এসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মানব জাতির তৈরী সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে সময়টা বেশ ভালো ভাবেই কেটে যায় আমাদের।

Khamsum Yulley Namgyal Chorten ঘুরে আমরা চলে আসি পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য Buddha Dordenma তে। এখানে মূল আকর্ষণ হচ্ছে প্রায় ১৬৯ ফুট উঁচু বুদ্ধদেবের মূর্তি। এই বুদ্ধমূর্তিটি যে বিল্ডিং এর উপর স্থাপিত সেই বিল্ডিং এর ভিতরে রয়েছে ১ লক্ষ ২৫ হাজার ছোট বুদ্ধমূর্তি, যেগুলোর মধ্যে এক লক্ষ মূর্তির উচ্চতা ৮ ইঞ্চি এবং বাকি ২৫০০০ মূর্তির উচ্চতা ১২ ইঞ্চি করে।

Buddha Dordenma তে ভালো কিছু সময় পার করে আমরা চলে আসি Memorial Chorten এ। ভুটানের দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার সময় আপনার মনে হবে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে পাল্লা দিয়েই ভুটানিজরা তাদের স্থাপনাগুলো তৈরি করেছে। Memorial Chorten দেখেও এরকমটিই মনে হবে। এ Chorten টি তৃতীয় রাজা Jigme Dorji Wangchuck (জিগমি দরজি ওয়াংচাক) এর স্মরণে ১৯৭৪ সালে তৈরি করা হয় । এই Chorten এ প্রতিদিন ভুটানিজরা তাদের পূজা-অর্চনা করে থাকে।

যে দেশে ভ্রমণ করতে এসেছি সে দেশের সরকারি বা রাজার কার্যালয় না ঘুরে দেখলে কি হয়! তাই  Memorial Chorten ঘুরে আমরা চলে আসি Tashchho Dzong(টাশ্চু জং) এ। এটি রাজার কার্যালয় হওয়াতে দর্শনার্থীদের জন্য এই Dzong এ প্রবেশের সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। এই Dzong টি ঘুরে দেখতে হলে আপনাকে ৫:৩০ মিনিট এরপর আসতে হবে।

রাজ কার্যালয়ে ঘুরে আমরা চলে যাই থিম্পু শহরের Changlimithang(চাংলিমিথাং) স্টেডিয়ামে। এই স্টেডিয়ামটি মূলত, প্রাচীন যুগে ভুটানের যুদ্ধ ময়দান ছিল। বর্তমানে সেই ময়দানটিকে স্টেডিয়ামে রুপান্তরিত করেছে। এই স্টেডিয়ামটি দুই ভাগে বিভক্ত। একটি ফুটবল গ্রাউন্ড অন্যটি ভুটানের জাতীয় খেলা Archery এর জন্য Archery Ground। Archery গ্রাউন্ডে আসলে দেখতে পাবেন দুই দলে বিভক্ত archery প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতায় যে দল বিজয়ী হয় তারা কিছুটা নেচে-গেয়ে জয় উদযাপন করে থাকে, যেটি খুবই মজার ব্যাপার। তবে খেলাটি দেখতে  সহজ ও মজার লাগলেও খেলাটি খুবই কঠিন, যেখানে বেশ দক্ষতার পরিচয় দিতে হয় তাদেরকে। কারণ ৪৫০ ফুট দূর থেকে লক্ষ্যভেদ করা মোটেও সহজ ব্যাপার না।

ভুটান ভ্রমণে এসে  প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য আর ভুটানিজদের তৈরি দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা গুলো ঘুরে ঘুরে দেখার পর চলে যাই ভুটানিজদের জাতীয় পশু Takin দেখতে, Takin Preserve Zoo তে। Takin হচ্ছে ছাগলের অন্য একটি প্রজাতি। Takin ছাড়াও এখানে অন্য জীব জন্তু ও দেখতে পাবেন। এখানে ঘুরতে এসে মোটেই খারাপ লাগেনি আমাদের কারণ, গরুর দেহের গঠনের সাথে ছাগলের মাথা বিশিষ্ট এই বিলুপ্তপ্রায় ছাগল প্রজাতি Takin আমাদের অবাকই করেছে।

চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখার পর জাদুঘর দেখতে আসাটা মন্দ কি! এখানে খুব চমকপ্রদ দেখার কিছু না থাকলেও, ভুটানিজদের গ্রাম্য জীবন সম্পর্কে কিছু ধারনা নিতে জুদুঘরটিও ঘুরে দেখি আমরা। জাদুঘরটির ভিতরে রয়েছে একটি ক্যান্টিন যেখান থেকে আপনি চাইলে  ভুটানিজদের খাঁটি খাবারের স্বাদ নিতে পারবেন।

চিড়িয়াখানা ও জাদুঘর ঘুরে আমরা চলে যাই  Thimpu Chu নদীতে। নদী ঘুরে চলে আসি  থিম্পু শহরের প্রাণকেন্দ্র clock tower square। এটি বাংলাদেশের ধানমন্ডিতে অবস্থিত রবীন্দ্র সরোবরের মত। ক্লক টাওয়ার স্কয়ারে বসে কিছু ভালো মুহূর্ত কাটিয়ে যেতে পারেন। ক্লক টাওয়ার এর আশেপাশে আপনি আপনার প্রয়োজনীয় সবকিছুই পাবেন। এর আশে-পাশেই হোটেল, ট্যাক্সি স্ট্যান্ড আর কেনাকাটা করার জন্য বিভিন্ন দোকান রয়েছে।

https://youtu.be/VGqin4FMiIE

 ভুটান ভ্রমণ Part 2

ভুটান ভ্রমণ Part 3

 

হাওড় ভ্রমণ (সুনামগঞ্জ)

বহু বছর আগে রাজারা  যেমন রাজ্যের সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে বজরায় করে বের হতেন নৌবিহারে আমরাও ঠিক এরকম একটি ভ্রমণের স্বাদ নিতে বের হয়েছিলাম টাঙ্গুয়ার হাওড়ের উদ্দেশ্যে। কিভাবে যাবো? খাবারের ব্যবস্থা কিভাবে করবো? কখন, কোথায় এবং কোন সময়ে যাবো? আর খরচ কিভাবে কম হবে?- এ সকল যাবতীয় প্রশ্নের হাত থেকে বাঁচার জন্য আমরা যোগ দেই বাংলাদেশের একটি ভ্রমণ group এর সাথে।

হাওরের উদ্দেশ্যে রাতে ঢাকা থেকে বাস যোগে সুনামগঞ্জ পৌছে সেখান থেকে লেগুনা করে চলে যাই তাহিরপুর বাজারে।

সেখানে নাস্তা সেরে ট্রলারে করে রওনা হয়েছিলাম আমরা। ভেসেছিলাম হাওড়ের বুকে। ভাসতে হয়েছিল বেশ কিছু সময় তবে এ সময়টা মোটেই বিরক্তিকর মনে হয়নি। কারণ চলার পথেই দেখতে পেয়েছিলাম বর্ষাকালের ভরা যৌবন। চারদিক থৈ থৈ করছে পানিতে, তার দুই ধারে রয়েছে ছোট ছোট গ্রাম। হাওরের বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে ছোট ছোট নৌকা আর ট্রলার।

ট্রলার থেকেই দেখা গিয়েছিল দূরে নিথর নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের মেঘালয়। আর মাথার উপর আকাশে খেলা করছিল মেঘের টুকরো।

পাহাড়, নদী, গ্রাম, আকাশ, মেঘ সব মিলে প্রকৃতির এমন এক বৈচিত্রের খেলা যা দেখে যা দেখে মনে হয়েছিল- শিল্পীর খুব যত্নে আঁকা ক্যানভাস গুলোকে দেখছি। যেখানে শিল্পী তার মনের কল্পনার সবটুকু দিয়ে তুলির আঁচড়ে প্রকৃতিকে ফুটিয়ে তুলেছে। বৈচিত্র দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম বারিক টিলা তে। এর উচ্চতা প্রায় ১৫০ ফুট।

এর ওপরে যেতে খুব বেশি কষ্ট করতে হয়নি। কারণ উঠার রাস্তা টা খুব বেশি খাড়া ছিল না। বারিক টিলার উপরে রয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তের বেড়া। বারেক টিলার উপরে উঠার পর এক পাশে চোখে পড়েছে শুধুই ভারতের মেঘালয় আর অন্য পাশটি মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা জাদুকাটা নদী।

বারিক টিলা থেকে আপনি একটা viewpoint বলতে পারে যেখান থেকে মেঘালয় আর যাদুকাটা নদী ভালো করে দেখা যায়। বারিক টিলা থেকে যাদুকাটা নদীর birds eye view দেখে আমরা আবার ঢালু পথ বেয়ে নেমে ট্রলারে উঠে আবার কিছু সময়  যাদুকাটা নদীর উপর ভেসে চলে আসি শিমুল বাগান দেখতে।

শিমুল বাগানটি জাদুকাটা নদীর তীরেই অবস্থিত। প্রায় ১০০ বিঘার বেশি জায়গার উপর শুধুই সৌখিনতার বসে শিমুল বাগানটি গড়ে তোলেন স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদিন। যেটি দেখতে ছুটে আসে ভ্রমণ প্রিয় মানুষেরা। শিমুল বাগানটিতে আমরা দেখছি শুধু সবুজের খেলা। তবে সময়ের সাথে এ বাগানের রুপও বদলে যায়। কোমল মায়াবী সবুজ রূপ ত্যাগ করে ধারণ করে রক্তিম রূপ। সে রূপ দেখতে হলে আপনাকে আসতে হবে বসন্তকালে।

শিমুল বাগান ঘুরে যাদুকাটা নদীতে গোসল ও দুপুরের খাবার পর্ব সেরে আমরা চলে আসি টেকেরঘাটে। টেকেরঘাটে নেমে প্রথমেই আপনার চোখে পড়বে একটি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ। এটি তৈরি করা হয় ৩রা ডিসেম্বর ২০১৩ সালে। দর্শক হিসেবে আপনি এটি ঘুরে ঘুরে দেখতে পারেন তবে ঘুরে দেখার সময় এর সম্মানের দিকও মাথায় রাখবেন। কারন এখানে এসে অনেকেই এর দেয়ালে নিজের নাম বা নাম্বার লিখে থাকেন যেটি খুবই লজ্জাজনক এবং স্মৃতিসৌধের প্রতি অসম্মানজনক। স্মৃতিসৌধের পাশে রয়েছে একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।

টেকের ঘাট নেমে হাঁটতে হাঁটতে আমরা চলে আসি  নীলাদ্রী লেকে। নীলাদ্রি লেকে যাওয়ার সময় আপনি অব্যবহৃত রেলপথ দেখতে পাবেন। যেটি চুনাপাথর বহন করার কাজে ব্যবহৃত হত। আর এই চুনাপাথরের উত্তোলনের কাজ হতো যেখানে নীলাদ্রি লেক দেখা যাচ্ছে। চুনাপাথর উত্তোলনের কাজ বন্ধ হয়ে যাবার পর নীলাদ্রি লেক টি তৈরি হয়। কাজ বন্ধ হয়ে গেলও পথিমধ্যে জীর্ণ যন্ত্রপাতি আজও সেই কাজের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

নীলাদ্রী লেকের পানি দেখতে নীলাভ আর সেই কারণেই স্থানীয়রা এটাকে নীলাদ্রি লেক বলে থাকেন। নীলাদ্রী লেকের পাশেই উঁচু-নিচু টিলার মতো জায়গা রয়েছে যেখানে দাঁড়িয়ে দেখা যায় নীলাদ্রী লেকের অপরূপ দৃশ্য আর ভারতের মেঘালয়। এই জায়গাটি গল্প করার জন্য বা রাতে পূর্ণিমা উপভোগ করার জন্য খুবই চমৎকার। আমাদেরও উদ্দেশ্য ছিল এখানে বসে পূর্ণিমা উপভোগ করা। কিন্তু ভাগ্য ছিল বিমুখ। যখন আমরা নীলাদ্রী লেকে যাই তখনই আকাশ মেঘলা ছিল এবং একটু পরপরই বৃষ্টি হচ্ছিল আর রাতে দেখতে পেয়েছিলাম বৃষ্টির উন্মাদ নৃত্য।

টেকের ঘাটে হাওড়ের উপড় ভেসে ট্রলারে রাত কাটানোর পর সকালে উঠে নাস্তা সেরে আবার ট্রলারে ভেসে চলে যাই  ওয়াচ টাওয়ার এ, যেখান থেকে দেখা যায় হাওরের wide view।

ওয়াচ টাওয়ারের পাশে নৌকা ভিড়িয়ে মনের উল্লাসে ঝাপাঝাপি করেছি আমরা । করেছি পাগলামি। মনে হয়েছিল কিছুটা ছেলেবেলা ফিরে পেয়েছিলাম আমরা। আপনিও চাইলে এখানে এসে আমাদের মত ছেলেবেলা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন তবে আপনাকে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট সাথে নিতে হবে। কারণ ভ্রমণে ঝুঁকি না নেওয়াই সুবুদ্ধির পরিচয়।

ওয়াচ টাওয়ারে গোসল ও খাওয়ার পর্ব সেরে আমরা ফিরতি পথ ধরেছিলাম। কিন্তু বর্ষাকালে বর্ষা তার উপস্থিতি জানান দেবে না তা তো হয় না। ঝুমঝুম শব্দে নেমে পড়ে বৃষ্টি। তবে এটাও বেশ উপভোগ করার মতোছিল।