সীতাকুন্ড ভ্রমণ || চন্দ্রনাথ পাহাড় || চট্টগ্রাম

ব্যস্ততাকে ঝেড়ে ফেলে স্বল্প সময়ের জন্য আমরা বের হয়েছিলাম সীতাকুন্ড ভ্রমণে। ভ্রমণটি ছিল মাত্র দুই দিনের। সময় স্বল্পতার কারনে আমরা শুধু চন্দ্রনাথ পাহাড় এবং মহামায়া লেক ঘুরে দেখি।

চন্দ্রনাথ পাহাড় ভ্রমণের উদ্দেশ্যে আমরা রাতে ঢাকা থেকে বাসে জার্নি করে নেমে যাই সীতাকুণ্ড বাজারে। সেখানে নাস্তা সেরে সোজা চলে আসি চন্দ্রনাথ পাহাড়ের নিচে। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের উচ্চতা প্রায় এক হাজার বিশ ফুট, যার উপরে রয়েছে চন্দ্রনাথ মন্দির। সেই মন্দির দেখতে হলে আপনাকে এক থেকে দেড় ঘন্টার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হবে। পাহাড়ে ওঠার পথে চোখে পরবে অন্নপূর্ণা ও বিষ্ণু মন্দির।মন্দির পেরিয়ে কিছুদূর গেলেই চোখে পড়বে ঝর্না আর এখান থেকেই দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে পথ। দুটি পথের এই গন্তব্যস্থান চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়া তবে দুই পথের একটি হচ্ছে সিড়ি পথ এবং অন্যটি পাহাড়ি পথ। ভ্রমণ ও এডভেঞ্চার প্রিয়দের জন্য পাহাড়ি পথ ধরে যাওয়াটাই উত্তম তবে সে ক্ষেত্রে অবশ্যই আপনাকে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। আমরা পাহাড়ী পথটিই বেছে নিয়েছিলাম।

চন্দ্রনাথ পাহাড়ের উপর যে মন্দিরটি রয়েছে সেটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত। এই তীর্থস্থান গড়ে ওঠার পেছনেও রয়েছে হিন্দুদের প্রাচীন ইতিহাস। হিন্দুদের দেবী পার্বতী সতী রূপে রাজা দক্ষ এর ঘরে জন্ম নেয়। আর সেই সতীর স্বামী ছিল হিন্দুদের মহাদেবতা শিব। দক্ষ রাজা একবার এক যজ্ঞের আয়োজন করে সেই যজ্ঞানুষ্ঠানে দক্ষ রাজা সতীর স্বামী শিবকে আমন্ত্রিত না করায় সতী অপমানিত ও লজ্জা বোধ করে এবং সেই রাগেই সতী আত্মহুতি দেয়। পরে শিব স্ত্রীর মৃত্যুর সংবাদ শুনে সেখানে উপস্থিত হয়ে স্ত্রীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে শুরু করেন পৃথিবীময় তান্ডব নৃত্য। তাই বিষ্ণু শিব কে শান্ত করার জন্য তার সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর মৃতদেহ কে ৫১ টি ভাগে বিভক্ত করে ফেলে। আর সতীর মৃত দেহের সেই ৫১টি দেহ ভাগ পতিত হয় ভারত, নেপাল, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা তে। যেই যেই জায়গাতে সতীর  দেহাংশ পতিত হয় সেখানেই গড়ে ওঠে হিন্দুদের তীর্থস্থান শক্তিপীঠ। তেমনি চন্দ্রনাথ পাহাড়ের উপরও সতীর দেহাংশ পড়ে গড়ে ওঠে এই তীর্থস্থান চন্দ্রনাথ মন্দির, যেখানে প্রতি বছর ফাল্গুন মাসে শিব চতুর্দশীতে আয়োজিত হয় মেলা, হয় তীর্থযাত্রা।চন্দ্রনাথ মন্দিরে যাওয়ার আগেই পড়বে বিরুপাক্ষ মন্দির। যেখানে খানিকটা বিশ্রাম নেয়া যেতে পারে আর এখান থেকেই দেখতে পাবেন দিগন্ত জুড়ে সবুজের গালিচা আর মেঘের খেলা। দূরে দেখা যাবে বঙ্গোপসাগর। এখানে কিছু সময় কাটানোর পর ক্লান্তির রেশ কেটে গিয়ে মন এবং প্রাণ দুটোই জুড়িয়ে যাবে।বিরুপাক্ষ মন্দির থেকে আধ মাইল পাহাড়ি পথ হাঁটলেই চন্দ্রনাথ মন্দির।

পাহাড়ের চূড়ায় শান্ত পরিবেশ বেশ খানিকটা সময় পার করে আমরা আবার পাহাড়ি পথ বেয়ে পাহাড়ের নিচে নেমে সেখান থেকে লেগুনা করে চলে যাই মহামায়া লেক এ। মহামায়া লেক এর মূল আকর্ষণ হচ্ছে আপনি এই লেকের মধ্যে কায়াকিং করতে পারবেন। তবে লেকের কাছে যাওয়ার আগে রাস্তার ধারে বিভিন্ন গাছের ছায়া তলে যে নিবিড় পরিবেশ রয়েছে সেখানে আপনি বন্ধু বা পরিবার নিয়ে পিকনিকও যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে একটা বিষয়ে সচেতন থাকবেন যে, পিকনিক শেষে ফিরে যাবার সময় কোন ময়লা ফেলে পরিবেশ নষ্ট করছেন কিনা কারণ আমাদের দেশ ও পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা আমাদেরই দায়িত্ব।মহামায়া লেকে কায়াকিং ছাড়াও ছোট নৌকা বা ট্রলারে করে নদীতে ঘুরে বেড়াতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে ছোট নৌকার ভাড়া লাগবে ৩০০ টাকা এবং চলার এর ভাড়া প্রতি জন ৩০ থেকে ৪০ টাকা।আমরা ট্রলারে করে ঘুরে বেড়াই মহামায়া লেক। মহামায়া লেক ঘুরে আমরা ফিরে আসি সীতাকুন্ড বাজারে। সুন্দর কিছু মূহুর্ত কাটিয়ে রাতের বাসে করে আবার ফিরে আসি চিরচেনা ব্যস্ত জীবনে।