হাওড় ভ্রমণ (সুনামগঞ্জ)

বহু বছর আগে রাজারা  যেমন রাজ্যের সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে বজরায় করে বের হতেন নৌবিহারে আমরাও ঠিক এরকম একটি ভ্রমণের স্বাদ নিতে বের হয়েছিলাম টাঙ্গুয়ার হাওড়ের উদ্দেশ্যে। কিভাবে যাবো? খাবারের ব্যবস্থা কিভাবে করবো? কখন, কোথায় এবং কোন সময়ে যাবো? আর খরচ কিভাবে কম হবে?- এ সকল যাবতীয় প্রশ্নের হাত থেকে বাঁচার জন্য আমরা যোগ দেই বাংলাদেশের একটি ভ্রমণ group এর সাথে।

হাওরের উদ্দেশ্যে রাতে ঢাকা থেকে বাস যোগে সুনামগঞ্জ পৌছে সেখান থেকে লেগুনা করে চলে যাই তাহিরপুর বাজারে।

সেখানে নাস্তা সেরে ট্রলারে করে রওনা হয়েছিলাম আমরা। ভেসেছিলাম হাওড়ের বুকে। ভাসতে হয়েছিল বেশ কিছু সময় তবে এ সময়টা মোটেই বিরক্তিকর মনে হয়নি। কারণ চলার পথেই দেখতে পেয়েছিলাম বর্ষাকালের ভরা যৌবন। চারদিক থৈ থৈ করছে পানিতে, তার দুই ধারে রয়েছে ছোট ছোট গ্রাম। হাওরের বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে ছোট ছোট নৌকা আর ট্রলার।

ট্রলার থেকেই দেখা গিয়েছিল দূরে নিথর নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের মেঘালয়। আর মাথার উপর আকাশে খেলা করছিল মেঘের টুকরো।

পাহাড়, নদী, গ্রাম, আকাশ, মেঘ সব মিলে প্রকৃতির এমন এক বৈচিত্রের খেলা যা দেখে যা দেখে মনে হয়েছিল- শিল্পীর খুব যত্নে আঁকা ক্যানভাস গুলোকে দেখছি। যেখানে শিল্পী তার মনের কল্পনার সবটুকু দিয়ে তুলির আঁচড়ে প্রকৃতিকে ফুটিয়ে তুলেছে। বৈচিত্র দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম বারিক টিলা তে। এর উচ্চতা প্রায় ১৫০ ফুট।

এর ওপরে যেতে খুব বেশি কষ্ট করতে হয়নি। কারণ উঠার রাস্তা টা খুব বেশি খাড়া ছিল না। বারিক টিলার উপরে রয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তের বেড়া। বারেক টিলার উপরে উঠার পর এক পাশে চোখে পড়েছে শুধুই ভারতের মেঘালয় আর অন্য পাশটি মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা জাদুকাটা নদী।

বারিক টিলা থেকে আপনি একটা viewpoint বলতে পারে যেখান থেকে মেঘালয় আর যাদুকাটা নদী ভালো করে দেখা যায়। বারিক টিলা থেকে যাদুকাটা নদীর birds eye view দেখে আমরা আবার ঢালু পথ বেয়ে নেমে ট্রলারে উঠে আবার কিছু সময়  যাদুকাটা নদীর উপর ভেসে চলে আসি শিমুল বাগান দেখতে।

শিমুল বাগানটি জাদুকাটা নদীর তীরেই অবস্থিত। প্রায় ১০০ বিঘার বেশি জায়গার উপর শুধুই সৌখিনতার বসে শিমুল বাগানটি গড়ে তোলেন স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদিন। যেটি দেখতে ছুটে আসে ভ্রমণ প্রিয় মানুষেরা। শিমুল বাগানটিতে আমরা দেখছি শুধু সবুজের খেলা। তবে সময়ের সাথে এ বাগানের রুপও বদলে যায়। কোমল মায়াবী সবুজ রূপ ত্যাগ করে ধারণ করে রক্তিম রূপ। সে রূপ দেখতে হলে আপনাকে আসতে হবে বসন্তকালে।

শিমুল বাগান ঘুরে যাদুকাটা নদীতে গোসল ও দুপুরের খাবার পর্ব সেরে আমরা চলে আসি টেকেরঘাটে। টেকেরঘাটে নেমে প্রথমেই আপনার চোখে পড়বে একটি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ। এটি তৈরি করা হয় ৩রা ডিসেম্বর ২০১৩ সালে। দর্শক হিসেবে আপনি এটি ঘুরে ঘুরে দেখতে পারেন তবে ঘুরে দেখার সময় এর সম্মানের দিকও মাথায় রাখবেন। কারন এখানে এসে অনেকেই এর দেয়ালে নিজের নাম বা নাম্বার লিখে থাকেন যেটি খুবই লজ্জাজনক এবং স্মৃতিসৌধের প্রতি অসম্মানজনক। স্মৃতিসৌধের পাশে রয়েছে একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।

টেকের ঘাট নেমে হাঁটতে হাঁটতে আমরা চলে আসি  নীলাদ্রী লেকে। নীলাদ্রি লেকে যাওয়ার সময় আপনি অব্যবহৃত রেলপথ দেখতে পাবেন। যেটি চুনাপাথর বহন করার কাজে ব্যবহৃত হত। আর এই চুনাপাথরের উত্তোলনের কাজ হতো যেখানে নীলাদ্রি লেক দেখা যাচ্ছে। চুনাপাথর উত্তোলনের কাজ বন্ধ হয়ে যাবার পর নীলাদ্রি লেক টি তৈরি হয়। কাজ বন্ধ হয়ে গেলও পথিমধ্যে জীর্ণ যন্ত্রপাতি আজও সেই কাজের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

নীলাদ্রী লেকের পানি দেখতে নীলাভ আর সেই কারণেই স্থানীয়রা এটাকে নীলাদ্রি লেক বলে থাকেন। নীলাদ্রী লেকের পাশেই উঁচু-নিচু টিলার মতো জায়গা রয়েছে যেখানে দাঁড়িয়ে দেখা যায় নীলাদ্রী লেকের অপরূপ দৃশ্য আর ভারতের মেঘালয়। এই জায়গাটি গল্প করার জন্য বা রাতে পূর্ণিমা উপভোগ করার জন্য খুবই চমৎকার। আমাদেরও উদ্দেশ্য ছিল এখানে বসে পূর্ণিমা উপভোগ করা। কিন্তু ভাগ্য ছিল বিমুখ। যখন আমরা নীলাদ্রী লেকে যাই তখনই আকাশ মেঘলা ছিল এবং একটু পরপরই বৃষ্টি হচ্ছিল আর রাতে দেখতে পেয়েছিলাম বৃষ্টির উন্মাদ নৃত্য।

টেকের ঘাটে হাওড়ের উপড় ভেসে ট্রলারে রাত কাটানোর পর সকালে উঠে নাস্তা সেরে আবার ট্রলারে ভেসে চলে যাই  ওয়াচ টাওয়ার এ, যেখান থেকে দেখা যায় হাওরের wide view।

ওয়াচ টাওয়ারের পাশে নৌকা ভিড়িয়ে মনের উল্লাসে ঝাপাঝাপি করেছি আমরা । করেছি পাগলামি। মনে হয়েছিল কিছুটা ছেলেবেলা ফিরে পেয়েছিলাম আমরা। আপনিও চাইলে এখানে এসে আমাদের মত ছেলেবেলা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন তবে আপনাকে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট সাথে নিতে হবে। কারণ ভ্রমণে ঝুঁকি না নেওয়াই সুবুদ্ধির পরিচয়।

ওয়াচ টাওয়ারে গোসল ও খাওয়ার পর্ব সেরে আমরা ফিরতি পথ ধরেছিলাম। কিন্তু বর্ষাকালে বর্ষা তার উপস্থিতি জানান দেবে না তা তো হয় না। ঝুমঝুম শব্দে নেমে পড়ে বৃষ্টি। তবে এটাও বেশ উপভোগ করার মতোছিল।